মূল কন্টেন্টে যান

আধ্যাত্মিক জগৎ

দেবতা ও দেবী

দেবতা

অগ্নি

অগ্নি বৈদিক দেবতাদের অন্যতম প্রধান দেবতা, অগ্নির দেবতা ও যজ্ঞের মুখ। তিনি দেবতা ও মানুষের মাঝখানে হোম-উপহার বহনকারী মধ্যস্থ; তাঁর সপ্ত জিহ্বা সাতটি শিখা-রূপে বর্ণিত। বিবাহ-অনুষ্ঠানে সপ্তপদীর আগুন এবং অগ্নিহোত্র যজ্ঞে তাঁর উপস্থিতি আবশ্যক — তাই হিন্দু আচারে অগ্নিকে 'প্রথম দেবতা' মানা হয়। ঋগ্বেদের অগ্নি-সূক্ত ও অগ্নিসাক্ষী বিবাহ তাঁকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আচারের উদাহরণ।

দেবতা

অন্নপূর্ণা

অন্নপূর্ণা অন্ন ও পুষ্টির দেবী, পার্বতীরই একটি রূপ। 'অন্নপূর্ণা' অর্থ 'অন্নে পূর্ণা' — যাঁর কোলে অন্নের অভাব হয় না; বারাণসীতে তাঁর বিখ্যাত মন্দিরে শিব নিজেও তাঁর সহচরী রূপে বিরাজ করেন বলে জনশ্রুতি। সংসারে অন্নই প্রথম প্রয়োজন, তাই অন্নপূর্ণার উপাসনা ক্ষুধা নিবারণ ও ভক্তের সমৃদ্ধির জন্য প্রচলিত। অনেক পরিবারে অন্নপূর্ণা স্তোত্র রান্নাঘরে পাঠ করা হয়, এবং অন্নদানকে তাঁর শ্রেষ্ঠ সেবা মনে করা হয়।

দেবতা

ইন্দ্র

ইন্দ্র বৈদিক দেবরাজ, স্বর্গের (স্বর্গলোক) অধিপতি ও বৃষ্টি-বজ্রের দেবতা। তাঁর অস্ত্র বজ্র, বাহন ঐরাবত নামের সাদা হাতি, এবং তিনি বৃত্রাসুরকে বধ করে আটকে পড়া জলরাশি মুক্ত করেন বলে ঋগ্বেদে বর্ণিত। কল্পবৃক্ষ, কামধেনু, অপ্সরা-গন্ধর্বের স্বর্গলোক ইন্দ্রের রাজধানী অমরাবতীর সঙ্গে যুক্ত কল্পনা। পরবর্তী পুরাণে তাঁর মাহাত্ম্য কমলেও 'দেবরাজ' শব্দ ইন্দ্রের সমার্থকই রয়ে গেছে।

দেবতা

কার্তিক

কার্তিক শিব ও পার্বতীর পুত্র, ষড়ানন (ছয় মস্তকবিশিষ্ট) এবং দেবসেনাপতি। পুরাণে তিনি তাড়কাসুর বধের জন্য দেবতাদের আকাঙ্ক্ষায় জন্ম নেন এবং তাঁর অস্ত্র হলো শক্তিধর; বাহন ময়ূর। দক্ষিণ ভারতে তিনি মুরুগান, স্কন্দ, সুব্রহ্মণ্য নামে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলায় দুর্গাপূজার প্রতিমায় লক্ষ্মী, সরস্বতী ও গণেশের সাথে তিনি উপাসিত হন; কার্তিক মাসের নামকরণ তাঁর নামেই হয়েছে।

দেবতা

কালী

কালী শক্তির উগ্র রূপ, সময় ও পরিবর্তনের দেবী হিসেবে পূজিত। তাঁকে সাধারণত করালবদনা, রক্তবর্ণ জিহ্বা, খড়্গ ও ছিন্নমুণ্ডধারিণী এবং শিবের বক্ষে দণ্ডায়মানা রূপে চিত্রিত করা হয়। বাংলায় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সাধনার মাধ্যমে কালী উপাসনা বিশেষ মাত্রা লাভ করে। দক্ষিণেশ্বর ও কালীঘাটের মতো মন্দির কালী উপাসনার প্রধান কেন্দ্র। আশ্বিন মাসের অমাবস্যায় (দীপাবলির রাতে) কালীপূজা পালিত হয়।

দেবতা

কৃষ্ণ

কৃষ্ণ বিষ্ণুর অষ্টম অবতার, ভাগবত পুরাণ ও মহাভারত অনুসারে মথুরায় জন্ম নিয়ে বৃন্দাবনে লালিত-পালিত হন এবং পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের সারথি ও পথপ্রদর্শক হিসেবে ভগবদ্গীতার উপদেশ দেন। বাংলায় চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধারায় রাধাকৃষ্ণের প্রেমভক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভাদ্রপদ কৃষ্ণাষ্টমীতে জন্মাষ্টমী এবং আষাঢ় শুক্লদ্বিতীয়ায় রথযাত্রা (জগন্নাথরূপে) তাঁর প্রধান উৎসব।

দেবতা

গঙ্গা

গঙ্গা পবিত্র নদীর দেবী, হিন্দুধর্মে পাপমোচনী হিসেবে পূজিতা। পুরাণ মতে ভগীরথের তপস্যায় স্বর্গ থেকে নেমে আসা গঙ্গার প্রবল স্রোত শিবের জটায় আটকে থেকে ধীরে ধীরে পৃথিবীতে পতিত হয়; তাই তিনি ভাগীরথী নামেও পরিচিত। গঙ্গাস্নানকে জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুণ্যকর্ম মনে করা হয় এবং গঙ্গাজলকে পবিত্রতা ও শুদ্ধির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গঙ্গা সপ্তমী, গঙ্গা দশহরা ও কুম্ভমেলা গঙ্গার প্রধান উপাসনা-উৎসব।

দেবতা

গণেশ

গণেশ শিব ও পার্বতীর পুত্র, গজানন (হস্তীমুণ্ডধারী) রূপে পরিচিত এবং বিঘ্নহর্তা ও সিদ্ধিদাতা হিসেবে পূজিত হন। যেকোনো শুভ কাজ বা পূজার শুরুতে সর্বাগ্রে গণেশের আরাধনা করার রীতি প্রচলিত। ভাদ্রপদ মাসের শুক্লা চতুর্থীতে গণেশ চতুর্থী তাঁর জন্মোৎসব হিসেবে পালিত হয়। তাঁর বাহন মূষিক (ইঁদুর), এবং মোদক তাঁর প্রিয় নৈবেদ্য বলে পরিচিত।

দেবতা

চণ্ডী

চণ্ডী বা চণ্ডিকা দেবী দুর্গার উগ্র রূপ, দেবী মাহাত্ম্যম্ (চণ্ডী পাঠ) গ্রন্থের প্রধান দেবী। এই ৭০০ শ্লোকের গ্রন্থে তিনি চণ্ড-মুণ্ড নামের দুই অসুরকে বধ করেন এবং রক্তবীজ নামক অসুরের প্রতিটি রক্তবিন্দু থেকে জন্মানো অসুর-সেনা ধ্বংস করেন — সেখান থেকেই তাঁর নাম চণ্ডী। নবরাত্রিতে সপ্তমী-অষ্টমী-নবমীতে চণ্ডীপাঠ বিশেষভাবে শুভ বলে বিবেচিত; শক্তিপীঠে ও দুর্গামন্দিরে তাঁর উপাসনা প্রচলিত।

দেবতা

জগদ্ধাত্রী

জগদ্ধাত্রী দুর্গারই একটি প্রশান্ত রূপ, 'বিশ্বধারিণী' বা 'জগতের ধারয়িত্রী' অর্থবহনকারী এই দেবীকে সিংহবাহিনী, চতুর্ভুজা এবং সর্পবেষ্টিত করীন্দ্রাসুরের ওপর অধিষ্ঠিতা রূপে চিত্রিত করা হয়। কালীপূজার প্রায় এক সপ্তাহ পর কার্তিক মাসের শুক্লনবমীতে তাঁর পূজা হয়, যা বিশেষভাবে চন্দননগর ও কৃষ্ণনগরে (নদিয়া) সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের হাতে এই পূজার প্রচলন শুরু হয়।

দেবতা

ত্রিপুরাসুন্দরী

ত্রিপুরাসুন্দরী শাক্ত-তান্ত্রিক ধারার দেবী, দশমহাবিদ্যার অন্যতম; তাঁকে ললিতা, ষোড়শী ও রাজরাজেশ্বরী নামেও অভিহিত করা হয়। 'ত্রিপুরা' অর্থ তিন জগৎ (ভূ, ভুবঃ, স্বঃ) — তিনি তিন জগতেরই সৌন্দর্য ও শক্তির আধার। তাঁর উপাসনা শ্রীচক্রে (শ্রীযন্ত্র) রূপে শ্রীবিদ্যা পদ্ধতিতে করা হয়, এবং তাঁকে চিরযৌবনা ষোল বছর বয়সী দেবী কল্পনা করা হয়। দক্ষিণ ভারত ও কাশ্মীরে তাঁর পূজা বিশেষ প্রসিদ্ধ; রামায়ণ-পুরাণেও ললিতোপাখ্যান বর্ণিত।

দেবতা

দত্তাত্রেয়

দত্তাত্রেয় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের সম্মিলিত অবতার, ঋষি অত্রি ও অনসূরার পুত্র। তাঁকে ত্রিমুণ্ডী এবং গাভী, কুকুর ও চতুর্বিংশতি গুরুসহ চিত্রিত করা হয়; তাঁর শিক্ষা দর্শনের সর্বোচ্চ রূপ অবধূত গীতায় সংকলিত। তাঁকে বেদান্ত ও তন্ত্র উভয় ধারার আচার্য মনে করা হয়, এবং ভক্তরা সিদ্ধিদাতা রূপে তাঁর উপাসনা করেন। মার্গশীর্ষ মাসের পূর্ণিমায় দত্ত জয়ন্তী তাঁর আবির্ভাব-উৎসব হিসেবে পালিত হয়।

দেবতা

দুর্গা

দুর্গা শক্তি ও মাতৃত্বের দেবী, যিনি অসুর মহিষাসুরকে বধ করার জন্য দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূতা হয়েছিলেন বলে মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবী মাহাত্ম্যম্‌ গ্রন্থে বর্ণিত আছে। তাঁর দশ হাতে বিভিন্ন দেবতার অস্ত্র শোভিত, এবং তিনি সিংহবাহিনী। বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজা বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব, যেখানে তাঁকে কৈলাস থেকে পিত্রালয়ে আগত কন্যারূপে কল্পনা করা হয়, সাথে থাকেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিক।

দেবতা

নারসিংহ

নারসিংহ বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার, অর্ধ-মানব অর্ধ-সিংহ মূর্তি। ভাগবত পুরাণ অনুসারে ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করতে তিনি সন্ধ্যাবেলায় স্তম্ভ থেকে আবির্ভূত হয়ে ভক্তিবিরোধী রাজা হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন। তাঁর এই রূপ ভক্তির রক্ষা ও অধর্মের সংহারের প্রতীক, এবং ভগবানের 'অতীতে ও ভবিষ্যতে' সর্বত্র উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। বৈশাখ মাসের শুক্লচতুর্দশীতে নরসিংহ জয়ন্তী তাঁর জন্মোৎসব হিসেবে পালিত হয়।

দেবতা

পার্বতী

পার্বতী হিমালয় ও মেনকার কন্যা, শিবের পত্নী এবং শক্তির সৌম্য রূপ। তাঁকে উমা, গৌরী ও ভবানী নামেও অভিহিত করা হয়; শিবের আগের পত্নী সতীর পুনর্জন্ম বলে পুরাণে বর্ণিত। তিনি গণেশ ও কার্তিকের মাতা, এবং নবরাত্রিতে তাঁরই বিভিন্ন রূপ (শৈলপুত্রী থেকে সিদ্ধিদাত্রী) পূজিত হয়। বৈবাহিক প্রেম, ধৈর্য ও তপস্যার আদর্শ রূপে তিনি হিন্দু সংস্কৃতিতে গভীরভাবে সম্মানিত।

দেবতা

বরুণ

বরুণ বৈদিক দেবতাদের অন্যতম প্রাচীন দেবতা, জল ও সমুদ্রের অধিপতি এবং ঋত (বিশ্বব্যবস্থার নৈতিক শৃঙ্খলা)র রক্ষক। তাঁকে হাতে পাশ (ফাঁস)ধারী রূপে চিত্রিত করা হয়, যা পাপীদের ধরতে পারে বলে কল্পনা; তিনি পশ্চিম দিকের দিকপাল। প্রাচীন ঋগ্বেদে বরুণ-ঋত সংযুক্তি নৈতিক ধারণার উৎকর্ষের সাক্ষ্য বহন করে। বৃষ্টির জন্য বরুণ-যজ্ঞ ও সমুদ্র-তীর্থে বরুণদেবের পূজা প্রচলিত।

দেবতা

বামন

বামন বিষ্ণুর পঞ্চম অবতার, বামন (ক্ষুদ্রকায়) ব্রাহ্মণের রূপ। ভাগবত পুরাণ অনুসারে দাতা রাজা বালির কাছে তিনি মাত্র তিন পা ভূমি প্রার্থনা করেন; দুই পায়ে স্বর্গ ও মর্ত্য মাপা হলে তৃতীয় পা রাখার জন্য বালি মাথা পেতে দেন, আর তাতে তাঁকে পাতালে প্রেরণ করা হয়। এই কাহিনি সীমাহীন দানের সাথে সীমাহীন দিব্যতার মিলন ও বিনয়ের জয়ের প্রতীক। ভাদ্রপদ মাসের শুক্লদ্বাদশীতে বামন জয়ন্তী পালিত হয়।

দেবতা

বিষ্ণু

বিষ্ণু ত্রিমূর্তির (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর) পালনকর্তা, বিশ্বের স্থিতি ও রক্ষার দেবতা। তাঁকে চতুর্ভুজায় শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মধারী এবং গরুড়বাহন রূপে চিত্রিত করা হয়; সৃষ্টির মধ্যবর্তী অবস্থায় তিনি ক্ষীরোদসাগরে শেষশয্যায় শয়ন করে থাকেন বলে বিশ্বাস। বিষ্ণুর দশটি প্রধান অবতারে (মৎস্য থেকে কল্কি পর্যন্ত) তিনি সংসারের রক্ষা করেন — যার মধ্যে রাম ও কৃষ্ণ এই অ্যাপে আলাদাভাবে বর্ণিত। একাদশী ব্রত বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে পালিত হয়, এবং ভাগবত ও বিষ্ণুপুরাণ তাঁর উপাসনার প্রধান গ্রন্থ।

দেবতা

ব্রহ্মা

ব্রহ্মা ত্রিমূর্তির সৃষ্টিকর্তা, ব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা দেবতা। পুরাণ মতে বিষ্ণুর নাভিকমল থেকে উদিত পদ্মে তিনি আবির্ভূত হন; তাঁর চার মুখ চার বেদের প্রতীক, এবং সহচরী ও বিদ্যাদেবী সরস্বতী তাঁর বাণী। পুরাণে বর্ণিত তাঁর সৃষ্টির পর তিনি কোনো এক মায়ার কারণে 'দেবী-অভিশাপে' তেমন পূজিত হন না; রাজস্থানের পুষ্করে তাঁর প্রধান বিখ্যাত মন্দির অবস্থিত। সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের চক্রে ব্রহ্মার স্থান শুরুতেই।

দেবতা

ভৈরব

ভৈরব শিবের উগ্র ও রক্ষক রূপ, অষ্টভৈরব রূপে আট দিকের দিকপাল বলে কথিত। তন্ত্র ও শাক্ত-ধারায় তাঁকে শক্তির সিংহদ্বারপাল হিসেবে পূজা করা হয়; তাঁর বাহন কুকুর, এবং তাঁকে কালভৈরব নামে বারাণসী ও উজ্জয়িনীতে বিশেষভাবে পূজিত। শনি প্রদোষ ও সোমবার তাঁর পূজার উপযুক্ত দিন বলে প্রচলিত বিশ্বাস। অহংকার ও ভ্রান্তি ধ্বংসকারী এই দেবতা ভক্তকে সত্যের সন্ধানে রক্ষা করেন।

দেবতা

মনসা

মনসা সর্পদেবী, বাংলা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অতি প্রাচীন লৌকিক দেবী। পৌরাণিক বিবরণে তাঁকে ঋষি কাশ্যপ বা জরৎকারুর কন্যা এবং নাগরাজ শেশ বা বাসুকির বোন হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তাঁর প্রধান কার্য সর্পদংশন থেকে রক্ষা ও সর্প-কোপ প্রশমন; তাঁকে কলস বা ঘটে পূজা করা হয় এবং তাঁর কাহিনি মনসামঙ্গল কাব্যে বিস্তৃত। শ্রাবণ মাসে নাগপঞ্চমীর আশেপাশে এবং সংক্রান্তিতে তাঁর বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

দেবতা

রাধা

রাধা বৃন্দাবনের গোপী, কৃষ্ণের পরমা প্রেয়সী এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধারায় প্রেমভক্তির (মধুর রস) সর্বোচ্চ প্রতিমূর্তি। ভাগবত পুরাণে তাঁকে আভ্যন্তরীণ হ্লাদিনী শক্তি বলে ব্যাখ্যা করা হয়; চৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষায় কৃষ্ণকে পেতে রাধার ভাবই ভক্তের আদর্শ। ভাদ্রপদ মাসের শুক্লাষ্টমীতে রাধাষ্টমী তাঁর জন্মোৎসব হিসেবে পালিত হয়। রাধাকৃষ্ণ যুগল-মূর্তি বৈষ্ণব ঘরানায় সর্বত্র পূজিত।

দেবতা

রাম

রাম বিষ্ণুর সপ্তম অবতার এবং বাল্মীকি রচিত রামায়ণ মহাকাব্যের নায়ক। অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র রাম আদর্শ পুত্র, স্বামী ও রাজার প্রতীক হিসেবে পূজিত — 'রামরাজ্য' ধারণাটি ন্যায়পরায়ণ শাসনের আদর্শ হিসেবে ভারতীয় সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। চৈত্র মাসের শুক্লনবমীতে রামনবমী তাঁর জন্মোৎসব হিসেবে পালিত হয়।

দেবতা

লক্ষ্মী

লক্ষ্মী ধন, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবী, বিষ্ণুর পত্নী। তাঁকে পদ্মাসনা, চতুর্ভুজা এবং স্বর্ণমুদ্রা বর্ষণকারিণী রূপে চিত্রিত করা হয়। বাংলায় তিনি গৃহলক্ষ্মী রূপে বিশেষভাবে পূজিত — প্রতি বৃহস্পতিবার (লক্ষ্মীবার) অনেক বাড়িতে ছোট আকারে লক্ষ্মীপূজা হয়, আর আশ্বিনের পূর্ণিমায় (কোজাগরী পূর্ণিমা) দুর্গাপূজার পাঁচ দিন পর ঘরে ঘরে বড় করে লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা সারা ভারতের দীপাবলির লক্ষ্মীপূজা থেকে পৃথক।

দেবতা

শিব

শিব ত্রিমূর্তির (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর) অন্যতম, সংহারের দেবতা এবং যোগীশ্বর রূপে পূজিত। তাঁকে সাধারণত জটাধারী, ত্রিনয়ন, গলায় সর্প ও মস্তকে চন্দ্রশোভিত রূপে চিত্রিত করা হয়, এবং লিঙ্গরূপেও ব্যাপকভাবে পূজিত হন। ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণচতুর্দশীতে মহাশিবরাত্রি তাঁর প্রধান উৎসব, যা শিব-পার্বতীর বিবাহ স্মরণে পালিত হয় বলে বিশ্বাস।

দেবতা

শীতলা

শীতলা বসন্ত রোগ (গুটি বসন্ত) ও ত্বক-জ্বর নিরাময়কারী দেবী, বাংলা ও উত্তর ভারতের বিশেষভাবে পূজিত দেবী। তাঁকে গর্দভবাহনা, হাতে খরপর (ধান ঝাড়ার ঝুড়ি) ও কখনো ঝাড়ু সহ চিত্রিত করা হয় — যা রোগ ঝেড়ে ফেলার প্রতীক। তাঁর নামের অর্থই 'শীতল' বা 'ঠাণ্ডা'। গ্রীষ্মকালে বিশেষ করে শীতলাষষ্ঠী (জামাই ষষ্ঠী) তিথিতে তাঁর পূজা হয়; পূজায় সাধারণত নিরামিষ নৈবেদ্য ও শীতল উপকরণ দান করা হয়।

দেবতা

ষষ্ঠী

ষষ্ঠী শিশু ও প্রসব-সুরক্ষার দেবী, বাংলার ঘরকন্নার অতি জনপ্রিয় দেবী। চন্দ্রমাসের ষষ্ঠ তিথি তাঁর, এবং 'ষষ্ঠীর গল্প' জাতীয় লোককথায় তাঁকে সন্তানরক্ষিণী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে; নবপত্রিকার মধ্যে কলাবউ বা নবপত্রিকা ষষ্ঠীর রূপ বলে গণ্য। বৈশাখ মাসে জামাই ষষ্ঠী ও অন্যান্য ষষ্ঠী-উৎসবে নবজাতকের মঙ্গলকামনায় তাঁর পূজা হয়। জ্বর-আকস্মিক অসুস্থতা থেকে শিশুকে রক্ষা করার অধিষ্ঠাত্রী রূপে তিনি মায়েদের প্রার্থনার দেবী।

দেবতা

সরস্বতী

সরস্বতী বিদ্যা, সঙ্গীত, কলা ও জ্ঞানের দেবী, ব্রহ্মার সহচরী হিসেবে বর্ণিত। তাঁকে শুভ্রবসনা, বীণাধারিণী এবং হংসবাহনা রূপে চিত্রিত করা হয়। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে (বসন্ত পঞ্চমী) বিদ্যালয় ও বাড়িতে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়, যেদিন শিশুদের হাতেখড়ি অনুষ্ঠানও অনেক পরিবারে সম্পন্ন হয়।

দেবতা

সূর্য

সূর্য সৌর দেবতা, বিশ্বের আলো ও প্রাণের উৎস। তাঁকে সাত ঘোড়ায় টানা রথে চড়ে আরুণী সারথ্যের চিত্রিত করা হয়; তাঁর পত্নী ঊষা ও ছায়া বলে পুরাণে বর্ণিত। বৈদিক যুগের অন্যতম প্রধান দেবতা তিনি — গায়ত্রী মন্ত্র সূর্যের উদ্দেশ্যে সম্বোধিত। রামায়ণের আদিত্যহৃদয় স্তোত্র রামকে যুদ্ধে শক্তি দেয়। কণারক (ওড়িশা) ও মোদেরা (গুজরাত) মন্দির সূর্য-উপাসনার বিখ্যাত কেন্দ্র, আর সূর্য নমস্কার প্রতিদিনের অনুশীলনে পরিচিত।

দেবতা

হনুমান

হনুমান রামের পরম ভক্ত ও মহাবলশালী বীর, পবনদেব ও অঞ্জনার পুত্র। রামায়ণ অনুসারে তিনি লঙ্কায় গিয়ে সীতার সন্ধান করেন, সঞ্জীবনী পর্বত এনে লক্ষ্মণকে বাঁচান এবং লঙ্কাদহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন; সীতার মঙ্গল আশীর্বাদে তিনি চিরঞ্জীবী বলে কথিত। মঙ্গলবার ও শনিবারে তাঁর বিশেষ পূজা প্রচলিত, এবং তাঁর অপর নাম বজরংবলী। শক্তি ও বিনয়ের এই প্রতীককে 'বালাজী' নামেও সারা ভারতে পূজা করা হয়।